নাজমুল হক নাহিদ, আত্রাই (নওগাঁ) প্রতিনিধি ::
মানুষের জীবনে ৩০ বছর মানে একটি পূর্ণ প্রজন্ম। কারও জীবনে এই সময়টা কাটে পরিবার, সন্তান, সুখ-দুঃখ আর স্বপ্ন বুননের মধ্য দিয়ে। কিন্তু রাহেলা বেগমের জীবনে এই দীর্ঘ ৩০ বছর কেটেছে চার দেয়ালের অন্ধকার কারাগারের বন্দি হয়ে। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামের বাসিন্দা রাহেলা বেগম (৬৫)।
১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান তিনি। সেই থেকে শুরু হয় তার দীর্ঘ বন্দি জীবন। যখন তিনি জেলে প্রবেশ করেন, তখন বয়স ছিল মধ্য বয়সের কোঠায় চুল ছিল কালো, শরীরে ছিল শক্তি, চোখে ছিল ভবিষ্যতের অনিশ্চিত ভয়। সময়ের নির্মম ঘূর্ণিতে আজ তিনি একজন বৃদ্ধা চুলে পাকা ধরা, শরীর ভেঙে পড়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল।
এমনকি অনেক সময় নিজের প্রতিবেশীদেরও চিনতে পারেন না। তবু এই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ের মাঝেও একটি স্বপ্ন আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন তিনি একদিন মুক্ত আকাশে শ্বাস নেবেন।
কারাগারে কাটানো দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহেলা বেগম। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, জেলখানায় যাওয়ার পর কাঁথা সেলাই করতাম।
পুলিশরা কাঁথা দিত, আমি সেলাই করতাম। কিন্তু দিন যত যেত, তত অস্থির লাগত। জেলখানার একদিন আমার কাছে এক বছরের মতো মনে হতো। মনে হতো দম বের হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, জীবন, সংসার, কিছুই মিলাতে পারতাম না চার দেয়ালের ভেতর। খুব কাঁদতাম । আমার দিকে যেন সরকার একটু নজর দেয়। আর বেশি কিছু বলার শক্তি নেই।
রাহেলার বড় বোন সাহেলা বেগম বলেন, এই পৃথিবীতে রাহেলার আপন বলতে এখন আমি ছাড়া কেউ নেই। জেলে থাকা অবস্থায় আমাদের বাবা- মা মারা গেছেন। তার স্বামী অন্যত্র সংসার গড়েছেন। জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার বাড়িতেই ঠাঁই হয়েছে তার।
তিনি আরও জানান, সরকারিভাবে যদি কোনো সহযোগিতা পাওয়া যেত, তাহলে জীবনের শেষ সময়ে অন্তত খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকতে পারত। সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমি অনুরোধ জানাই মানবিক দৃষ্টিতে যেন তারা এগিয়ে আসেন।
নওগাঁর জেলসুপার রত্মা রায় জানান, রাহেলা বেগমের সশ্রম কারাদন্ডের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু আদালতের ধার্য করা পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে না পারায় তার মুক্তি আটকেছিল।
কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশনায় ওই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হলে গত ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। আমরা চাই, জীবনের বাকি সময়টা তিনি স্বাভাবিকভাবে কাটাতে পারেন।
অবশেষে একজন মানবিক কর্মকর্তার উদ্যোগে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহায়তায় তিন দশকের বন্দি জীবনের অবসান ঘটে রাহেলা বেগমের।
কারাগারের লোহার ফটক পেরিয়ে যখন তিনি বাইরে আসেন, তখন চোখে ছিল বিস্ময়, মুখে ছিল অশ্রু, আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস। রাহেলার মুক্তি কেবল একজন বন্দির মুক্তি নয় এটি আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত প্রশ্ন। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃদ্ধার পাশে রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা দাঁড়াবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। #
caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/eibela12/public_html/wp-includes/functions.php on line 6121caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/eibela12/public_html/wp-includes/functions.php on line 6121
Leave a Reply