অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধ দেখুন রাষ্ট্রের ভিত শক্তিশালী করতে আইনের শাসন ফেরাতে হবে – এইবেলা
  1. admin@eibela.net : admin :
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধ দেখুন রাষ্ট্রের ভিত শক্তিশালী করতে আইনের শাসন ফেরাতে হবে হাকালুকির ‘হাওরখাল’ বিলের উন্মুক্ত পুনঃনিলাম কাল কুলাউড়ায় ‘সীমান্তের ডাক’র গুণীজন সংবর্ধনা- ড. আবেদ চৌধুরী ও মাহিদুর রহমানকে সম্মাননা দর ওঠেছে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা- হাকালুকির ‘হাওরখাল’ বিলের কাঙ্খিত সরকারি দর না ওঠায় নিলাম কার্যক্রম স্থগিত কমলগঞ্জে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার ৩ কমলগঞ্জের কালী প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে কৃতি শিক্ষার্থী ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত ছাতকে গোবিন্দগঞ্জ পশুর হাট নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সুনামগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি ছাতক থানার মিজানুর রহমান বড়লেখায় সাংবাদিক খলিলুর রহমানের পিতার মৃত্যুবার্ষিকী পালন কুলাউড়ায় পৌরসভা সেলুন সমিতির আয়োজনে বিশ্বকর্মা পূজা অনুষ্ঠিত

অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধ দেখুন রাষ্ট্রের ভিত শক্তিশালী করতে আইনের শাসন ফেরাতে হবে

  • বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

Manual6 Ad Code

এম এম শাহীন::

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু, সুউচ্চ ভবন কিংবা অর্থনীতির আকার দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় তখনই, যখন আইন দুর্বল ও ক্ষমতাবান—উভয়ের জন্য সমানভাবে কার্যকর থাকে। অবকাঠামো উন্নত হতে পারে, অর্থনীতি বড় হতে পারে, সরকার শক্তিশালী হতে পারে; কিন্তু আইন যদি দুর্বলের ওপর কঠোর আর ক্ষমতাবানের সামনে নমনীয় হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের ভিত দুর্বলই থেকে যায়।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি সহজ প্রশ্ন আছে—অপরাধ করার পর একজন মানুষ কাকে বেশি বিশ্বাস করে : আইনকে, নাকি অপরাধীর অর্থ, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিচয়কে?
যেদিন একজন অপরাধী নিশ্চিত হয়ে যায়, ‘আমার দল আছে, নেতা আছে, টাকা আছে—আমার কিছু হবে না’; সেদিন থেকেই আইনের শাসন দুর্বল হতে শুরু করে। একইভাবে একজন সাধারণ নাগরিক থানায় যাওয়ার আগে যদি কোনো নেতা, এমপি, মন্ত্রী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোনের প্রয়োজন অনুভব করেন, তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের কেন্দ্রে আইন যথেষ্ট শক্তিশালী বা কার্যকর নেই।
জার্মানিতে প্রায় তিন বছর এবং আমেরিকায় দীর্ঘ প্রবাসজীবনে আমি একটি বিষয় খুব কাছ থেকে দেখেছি। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর শক্তি শুধু তাদের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা কিংবা উন্নত অবকাঠামোয় নয়; তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি আইনের শাসন। এসব দেশেও অপরাধ আছে, দুর্নীতি আছে, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও আছে। কোনো ব্যবস্থাই নিখুঁত নয়। পার্থক্য হলো, সেখানে একটি মৌলিক নীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
পুলিশ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারে, কিন্তু পুলিশ নিজেও জবাবদিহির বাইরে নয়। সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়। সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাবানের অনিয়ম অনুসন্ধান করতে পারে। একজন সাধারণ নাগরিকও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়ানোর অধিকার রাখেন। অর্থাৎ আইনের শাসন শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করে না; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগকারীদেরও আইনের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখে।
এই ব্যবস্থার সাফল্য অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল করার মধ্যে নয়—পৃথিবীর কোনো দেশই তা পারেনি। সাফল্য হলো অপরাধীর মনে এই উপলব্ধি জাগিয়ে রাখা, আজ না হোক কাল তাকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে। ক্যামেরার ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, আর্থিক লেনদেন, ডিএনএ, ডিজিটাল রেকর্ড, ফরেনসিক প্রমাণ কিংবা নতুন সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বহু বছর পরও অপরাধের রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। অর্থ, ক্ষমতা বা রাজনৈতিক যোগাযোগ সব সময় তাকে রক্ষা করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তাই আইনের প্রতি প্রয়োজনীয় ভীতি ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো আইনের প্রতি সেই ভয় ফিরিয়ে আনা।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আমাদের সামনে একটি ভয়াবহ বাস্তবতা উন্মোচিত করেছে। আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের রাজনৈতিক ক্ষোভ ছিল প্রবল। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—পুলিশের বিরুদ্ধেও মানুষের গভীর ক্ষোভ ও অনাস্থা জমেছিল।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই অস্থিরতার সময় সারা দেশে প্রায় ৪৬০টি পুলিশ স্থাপনা হামলা, অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের শিকার হয়। বহু থানা অচল হয়ে পড়ে, অস্ত্র-গোলাবারুদ লুট হয় এবং একপর্যায়ে দেশের পুলিশিং ব্যবস্থা চরম বিপর্যস্ত হয়।
থানায় আগুন দেওয়া, পুলিশ হত্যা কিংবা সরকারি অস্ত্র লুট কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সভ্য রাষ্ট্রে আইনের বাইরে প্রতিশোধের কোনো স্থান থাকতে পারে না। কিন্তু শুধু হামলাকারীদের অপরাধের কথা বলে থেমে গেলে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিই এড়িয়ে যাওয়া হবে—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মানুষের এত গভীর ক্ষোভের জন্ম হলো কেন?
থানা রাষ্ট্রের স্থানীয় উপস্থিতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। মানুষ সেখানে নিরাপত্তা, অভিযোগ ও সুরক্ষার আশায় যায়। সেই থানা যখন জনরোষের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রকে আত্মসমালোচনা করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সমাজ পুলিশকে নিরপেক্ষ আইনপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন। বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে মামলা, গণহারে আসামি করা, গ্রেপ্তার ও হয়রানি, গুম-খুনের অভিযোগ, সভা-সমাবেশে বাধা, প্রভাবশালীদের রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ উপেক্ষার অভিজ্ঞতা মানুষের মনে ক্ষোভ জমিয়েছে।
যখন পুলিশ অপরাধের চেয়ে অপরাধীর পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়, রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে সুরক্ষা দেয় আর অন্য পরিচয় হয়রানির কারণ হয়, থানায় ন্যায়বিচারের বদলে তদবির, ঘুষ কিংবা রাজনৈতিক সুপারিশ প্রয়োজন হয়, তখন পুলিশ জনগণের চোখে আইনরক্ষক না হয়ে ক্ষমতা সুরক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের বিস্ফোরণকে এই দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
এই প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নজরদারির জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এ আহ্বান জানান।
এর আগেও জাতিসংঘ বাংলাদেশে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন তদন্ত, বেসামরিক নজরদারি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কার্যকর জবাবদিহির সুপারিশ করেছে। মূল বার্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বাধীন ও কার্যকর নজরদারি অপরিহার্য।
প্রায় ২৫ বছর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদে আমি একই ধরনের একটি প্রশ্ন তুলেছিলাম। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চেয়েছিলাম, পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধ ও তদন্তে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বাহিনী গঠন ও পরিচালনার কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কি না। উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, পুলিশ সিকিউরিটি সেল রয়েছে এবং কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
আজ প্রায় ২৫ বছর পরও আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি, পুলিশের ভেতরে দুর্নীতি, অপরাধ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচরণ শনাক্ত ও তদন্তে একটি শক্তিশালী পেশাদার কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা জরুরি। তবে সেটিই যথেষ্ট নয়। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন বেসামরিক নজরদারিও থাকতে হবে। পুলিশকে শক্তিশালী করতে হবে, তবে জবাবদিহির বাইরে রেখে নয়।
বাংলাদেশকে শুধু রাজনীতিবিদেরাই ভালোবাসেন—এমন ধারণা ভুল। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, আইনজীবী, সরকারি কর্মচারী ও প্রবাসী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই দেশপ্রেম আছে। রাজনীতিতেও এমন মানুষ ছিলেন এবং আছেন, যারা মানুষের জন্য ব্যক্তিগত সুখ, সময়, অর্থ ও সম্পদ বিসর্জন দিয়েছেন; রাজনীতিকে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের সিঁড়ি বানাননি।
কিন্তু বিপরীত বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। ক্ষমতার আশ্রয়ে সম্পদ গড়া, দুর্নীতি, ঘুষ, অর্থ পাচার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের সংস্কৃতি আমাদের সমাজ ও দেশকে দীর্ঘদিন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সমস্যাটি শুধু রাজনীতিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রশাসন ও সেবাব্যবস্থার বহু স্তরে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ সেই বাস্তবতার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৮১.৬ শতাংশ পরিবার সেবা নিতে গিয়ে কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে এবং ৬৩.৬ শতাংশ পরিবারকে ঘুষ দিতে হয়েছে। এক বছরে প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার বেশি। এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক কতটা দুর্বল হয়েছে, তারও একটি খণ্ডচিত্র।
দেশের নাগরিকেরা যখন মনে করেন, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন, তদবির ছাড়া ন্যায়বিচার অনিশ্চিত এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব, তখন আইন বইয়ে থাকলেও বাস্তবে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।
সংসদ সদস্য হিসেবে আমি এর বিপরীত একটি অভিজ্ঞতাও খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার নির্বাচনী এলাকায় (মৌলভীবাজার-২) ২০০১ সালের আগের পাঁচ বছরে প্রশাসনের ওপর দলীয় প্রভাব ছিল প্রবল। আমার জানা ও সংরক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, সেই সময়ে দেড় শতাধিক বাড়িতে ডাকাতি, দুই শতাধিক মোটরসাইকেল চুরি ও ছিনতাই, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছিনতাই, এক রাতেই শহরের ২৫টি দোকানে চুরি এবং প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীদের অর্থ লুটের ঘটনা ঘটে। অসংখ্য রাজনৈতিক মামলা ও হামলায় জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল, চুরি ঠেকাতে মানুষ গরুর গলায়ও তালা লাগাতেন।
আমি সংসদ সদস্য হওয়ার পর প্রশাসনকে শুরুতেই একটি নীতি স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম—অপরাধীর দল দেখবেন না, পরিচয় দেখবেন না, সে আমার লোক কি না সেটিও দেখবেন না। অপরাধ দেখবেন এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকেও জবাবদিহি করতে হবে।
ব্যক্তিগত সংরক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, আমার পাঁচ বছরের (২০০১-২০০৬) মেয়াদে ডাকাতির সংখ্যা নেমে এসেছিল পাঁচটিতে, দোকান চুরির ঘটনা ছিল মাত্র একটি, মোটরসাইকেল চুরি ও ছিনতাই কার্যত শূন্যে নেমে এসেছিল এবং রাজনৈতিক মামলা ছিল শূন্য।
একই এলাকা, একই রাষ্ট্র, একই পুলিশ—ফল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই অভিজ্ঞতার শিক্ষা খুবই সরল। আইনশৃঙ্খলার উন্নতির জন্য সব সময় নতুন আইন, নতুন বাহিনী কিংবা আরও জনবল বা অস্ত্র প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যমান আইন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পুলিশকে পেশাগত দায়িত্ব পালনে স্বাধীনতা দেওয়া।
আমি জাতীয় সংসদে স্পিকারের মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলাম, ১৮ মাসে আইনশৃঙ্খলার অভূতপূর্ব উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে; কিন্তু কেন্দ্র, জেলা ও বিভাগ থেকে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা কঠিন হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কথা জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এই অভিজ্ঞতাই আমাকে শিখিয়েছে, একজন পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে যদি ভাবতে বাধ্য হন, ‘লোকটি কার?’—তাহলে তার পেশাগত স্বাধীনতা সেখানেই বাধাপ্রাপ্ত হয়।
রাষ্ট্রের প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘লোকটি কে’ না দেখে লোকটি অপরাধ করেছে কি না, সেটা দেখা। সে ক্ষমতাসীন দলের, বিরোধী দলের, মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ, বড় ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী আমলা কিংবা কোনো নেতার আত্মীয়—আইনের প্রয়োগে এসব পরিচয় কোনো বিশেষ সুবিধা দিতে পারে না। কারণ আইনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কঠোরতায় নয়, তার সমতায়। দুর্বলের জন্য কঠোর আইন আর ক্ষমতাবানের জন্য নমনীয় আইন, আইনের শাসন নয়; সেটি ক্ষমতার শাসন।
বাংলাদেশ পুলিশের মধ্যে অসংখ্য সৎ, দক্ষ ও সাহসী কর্মকর্তা রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলা, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রাপ্তির মাপকাঠি হতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহু পুলিশ সদস্য জীবন দিয়েছেন। তাঁদের অবদান অস্বীকার করলে অন্যায় হবে। বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলাই তাঁদের মর্যাদা রক্ষা ও সম্মান প্রদর্শনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
অতীতেও নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরিচালিত হয়েছিল এবং পরে র‍্যাব গঠন করা হয়েছিল। এসব পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন রয়েছে এবং ইতিহাস অবশ্যই সেগুলোর মূল্যায়ন করবে। তবে একটি রাজনৈতিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যে, আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে নিজের দলের লোককেও ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা ছাড়া নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বেগম খালেদা জিয়া সেটি করে তা প্রমাণ করেছিলেন বলেই শেষ যাত্রায়ও কোটি মানুষের উপস্থিতি তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা-সম্মান জানিয়েছিল।
আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সামনে আরও বড় সুযোগ রয়েছে। ‘অপরাধীর কোনো দল নেই’—এই নীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দৃশ্যমান নীতিতে পরিণত করা যেতে পারে। কারণ বিরোধী দলের অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ; আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হয় নিজের দলের অপরাধীর বিরুদ্ধে একই আইন সমভাবে প্রয়োগের সময়। বিগত সাত মাসে প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপনও করেছেন।
ক্ষমতাসীন দলের চাঁদাবাজকে বুঝতে হবে, দলীয় পরিচয় তাকে রক্ষা করবে না। দখলদারকে বুঝতে হবে, নেতার সঙ্গে তোলা ছবি কোনো আইনি সুরক্ষাকবচ নয়। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে বুঝতে হবে, রাজনৈতিক যোগাযোগ তদন্ত ঠেকাতে পারবে না। সন্ত্রাসীকে বুঝতে হবে, তার পেছনে যত বড় নেতাই থাকুন না কেন, অপরাধের দায় তাকেই বহন করতে হবে।
এই পরিবর্তন বাস্তবে আনতে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে : পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুতর অসদাচরণ তদন্তে স্বাধীন ও শক্তিশালী জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা গঠন; পুলিশের অভ্যন্তরে কার্যকর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ও পেশাগত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা; নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে মাপকাঠি করা; তদন্তকে সাক্ষ্য, ফরেনসিক প্রমাণ, ডিএনএ, সিসিটিভি, ডিজিটাল তথ্য ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিনির্ভর করা; থানায় অভিযোগ ও মামলা গ্রহণ সহজ ও ডিজিটাল করা এবং চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মব সহিংসতা ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দলনির্বিশেষে শূন্য সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা।
শুধু পুলিশকে সংস্কার করলেই হবে না। পুরো ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে। পুলিশ অপরাধী ধরল, কিন্তু তদন্ত দুর্বল হলো; তদন্ত শেষ হলো, প্রসিকিউশন ব্যর্থ হলো; মামলা আদালতে গিয়ে বছরের পর বছর ঝুলে থাকল—তাহলে অপরাধীর মনে আইনের ভয় জন্মাবে না। পুলিশ, তদন্ত, প্রসিকিউশন ও আদালতকে একই কার্যকর বিচারিক শৃঙ্খলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের পেশাগত ও মানবিক কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে। পর্যাপ্ত বেতন, আবাসন, যৌক্তিক কর্মঘণ্টা, প্রশিক্ষণ, ছুটি, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও পারিবারিক নিরাপত্তা ছাড়া একটি বাহিনীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
আমি ২০০১-২০০৬ সালে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বহুবার বলেছি—পুলিশকে শক্তিশালী করতে হবে, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে নয়। জবাবদিহিহীন শক্তিশালী পুলিশ নাগরিকের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা তৈরি করে; আবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পেশাগত স্বাধীনতা হারানো পুলিশ অপরাধীর মধ্যে দায়মুক্তির সাহস তৈরি করে। আমাদের প্রয়োজন এমন পুলিশ, যাকে অপরাধী ভয় করবে এবং নিরপরাধ মানুষ বিশ্বাস করবে।
পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষাও এখানেই। তাদের সমাজ বা সংস্কৃতি অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক নীতি শেখার আছে—পুলিশ কতটা ক্ষমতাবান, সেটি আসল কথা নয়; আইন কতটা ক্ষমতাবান, সেটিই আসল কথা।
ইউরোপ ও আমেরিকায় সরকার বদলায়, নেতৃত্ব বদলায়, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে-যায়। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে আইনের মৌলিক চরিত্র বদলে যায় না। আমার দীর্ঘ প্রবাস ও সাংবাদিকতা জীবনে কোনো অপরাধীর পক্ষে রাজনৈতিক নেতা পুলিশকে ফোন করে দলীয় পরিচয়ে দায়মুক্তি আদায়ের সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ হিসেবে দেখিনি। ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের জন্য এক আইন আর বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরেক আইন—এমন ধারণা আইনের শাসনের মূলনীতিরই পরিপন্থী। বাংলাদেশেও এই নীতিকে শক্তিশালীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। মানুষ নিরাপদে চলতে চায়, পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে চায়, রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চায়। প্রবাসীরা দেশে এসে পরিবার-পরিজন নিয়ে যেকোনো স্থানে নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করে যেন বলতে পারেন, আমার দেশ নিরাপদ। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এসব উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু আইনের শাসন দুর্বল হলে উন্নয়নের সুফলও টেকসই ও নিরাপদ থাকে না। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় থাকেন, ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির শিকার হন, দুর্নীতি বাড়ে এবং রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়।
রাষ্ট্র বদলানোর অর্থ তাই শুধু সরকার বদলানো নয়। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা ক্ষমতার মুখ বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না। রাষ্ট্র বদলায় তখনই, যখন ক্ষমতা আইনকে নিয়ন্ত্রণ করা বন্ধ করে এবং আইন ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
২০২৪ সালের ঘটনাবলি আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছে। মানুষের ক্ষোভকে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে ব্যাখ্যা করলে চলবে না। পুলিশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ। সেই মুখ যখন ন্যায়বিচারের বদলে ভয়, পক্ষপাত, মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নির্দেশ কিংবা নির্বাচনী অনিয়মে সহায়তার অভিযোগের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন শুধু একটি বাহিনী নয়—রাষ্ট্রের প্রতিই মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে।
এই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি ঐতিহাসিক বার্তা দিতে পারেন : ‘বাংলাদেশে আর দলীয় পুলিশ নয়, দলীয় প্রশাসন নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধীর দায়মুক্তি নয়; আমার নিজের দলের কেউ অপরাধ করলেও তার বিরুদ্ধে একই আইন চলবে।’ এমন ঘোষণা যদি বাস্তব পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয়, তবে তা বহু উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়েও শক্তিশালী রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বার্তা হয়ে উঠতে পারে।
একজন সাধারণ নাগরিক বিপদে পড়ে কোনো নেতা, এমপি কিংবা মন্ত্রীকে ফোন করার আগে যদি নির্ভয়ে পুলিশকে ফোন করতে পারেন, তবে বুঝতে হবে পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। একজন ব্যবসায়ী যদি জানেন চাঁদা না দিয়েও ব্যবসা করা সম্ভব, রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা বাড়বে। বিরোধী দলের একজন কর্মী যদি বিশ্বাস করেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পুলিশ তাকে হয়রানি করবে না, তাহলে আইনের শাসন শক্তিশালী হবে। আর ক্ষমতাসীন দলের একজন অপরাধী যদি বুঝতে পারেন দল, অর্থ কিংবা নেতার সঙ্গে ছবি তাকে আইনের হাত থেকে রক্ষা করবে না, তখনই রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার বাস্তব প্রমাণ মিলবে।
সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি পুলিশের হাতে থাকা অস্ত্র নয়, সরকারের হাতে থাকা ক্ষমতাও নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি নাগরিকের এই বিশ্বাস—দেশে আইন আছে। আইন সবার জন্য এবং সব নাগরিকের জন্য সমভাবে কার্যকর হবে।
ছোটবেলায় মায়েদের মুখে শুনেছি, ‘ঘুমাও, ভূত আসবে।’ পরে জার্মানিতে মজার ছলে শুনেছি, ‘উরব চড়ষরুবর শড়সসঃ’—পুলিশ আসছে।
সভ্য রাষ্ট্রে ‘পুলিশ আসছে’ শুনে ভয় পাওয়ার কথা অপরাধীর, নিরপরাধ মানুষের নয়। বিপদে পড়া মানুষের কাছে ‘পুলিশ আসছে’ কথাটির অর্থ হওয়া উচিত—সাহায্য আসছে, নিরাপত্তা আসছে, আইন আসছে। সত্যিকারের রাষ্ট্র সংস্কারের সূচনা সেখানেই।
যেদিন অপরাধী তার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আইনকে বেশি ভয় করবে এবং সাধারণ মানুষ প্রভাবশালীর ফোনের চেয়ে আইনের ওপর বেশি ভরসা করবে, সেদিনই বলা যাবে বাংলাদেশ বদলাতে শুরু করেছে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ভিত শক্ত রাখে কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা সরকার নয়—বরং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা এবং অন্যায় করলে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে, অপরাধীর মনের এই ভয়।

Manual3 Ad Code

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি, ঠিকানা এবং সাবেক সংসদ সদস্য।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২ - ২০২৪
Theme Customized By BreakingNews

Follow for More!