কমলগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নাচে-গানে সাঙ্গ হলো ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি মহারাসলীলা – এইবেলা
  1. admin@eibela.net : admin :
সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
হাকালুকি হাওর পাড়ের কৃষকদের বৈরী আবহাওয়া আর বানের জলের সাথে লড়াই  ছাতক কৃষকের কান্না : পাহাড়ি ঢল–টানা বৃষ্টিতে ফসল ডুবছে ভুয়া এলসিতে পাচারকালে- বড়লেখায় দেড় কোটি টাকার ভারতীয় জিরার চালান জব্দ : গ্রেফতার ১, বিজিবির ওপর হামলা ওসমানীনগরে পোস্ট অফিসে ঢুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা পয়সা লুট ঢাকা-সিলেট ডাবল রেললাইন হবে: প্রধানমন্ত্রী কুলাউড়ায় এসপিকে ঘুষ দিতে গিয়ে আটক ২ জুড়ীতে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিজিবির খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রদান মে দিবসের চেতনায় মজুরি বৈষম্যের অবসান হয়নি নারী শ্রমিকদের ছাত‌কে প্রবাসীর পক্ষে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা: আদালতের আদেশে দুই দোকানঘর জব্দ কানাডাস্থ জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব টরন্টোর নির্বাচন : তুহিন-তানবীর-এজাজ পরিষদের পরিচিতি সভা

কমলগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নাচে-গানে সাঙ্গ হলো ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি মহারাসলীলা

  • শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৪

Manual8 Ad Code

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি :: বর্ণাঢ্য আয়োজনে তুমুল হৈ চৈ, আনন্দ-উৎসাহে ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল আর শঙ্খ ধ্বনির মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মের অবতার পুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তার সখি রাধারলীলাকে ঘিরে কার্তিকের পূর্ণিমা তিথিতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শনিবার ঊষালগ্নে সাঙ্গ হলো মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ও আদমপুরে মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব মহারাসলীলা। মণিপুরী সম্প্রদায়ের এ বৃহত্তম উৎসব উপলক্ষে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মণিপুরি তাতঁবস্ত্র প্রদর্শনী ও শিববাজার এলাকায় বিশাল মেলা বসে। শুক্রবার দুপুরে কমলগঞ্জের উভয়স্থানে রাখালনৃত্যের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল রাসলীলা। রাসোৎসবে জাতি, ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। সব ধরনের সুবিধা বিদ্যমান থাকায় এখানকার রাসলীলা বড় উৎসবে রূপ নিয়েছিল।

শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কমলগঞ্জে হাজির হয়েছিল নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা পেশার হাজারো মানুষ। তাদের পদচারণে দুপুর থেকে মুখর হয়ে ওঠে মণিপুরি পল্লি। শনিবার ঊষালগ্নে এ উৎসব শেষ হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে। কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়া মন্ডপ প্রাঙ্গণে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, আদমপুরের মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্সসহ আরো দুটি মন্ডপ প্রাঙ্গণে মণিপুরি মী-তৈ সম্প্রদায়ের আয়োজনে হয়েছে মহারাসোৎসব।

Manual5 Ad Code

রাস উৎসব ঘিরে প্রতিবারের মতো এবারও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। বসেছিল রকমারি আয়োাজনে বিশাল মেলা। উৎসবে যোগ দিতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার ভক্ত-অনুরাগী পর্যটক এসেছেন এখানে। ভিড় সামলাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়।

মাধবপুর (শিববাজার) জোড়ামন্ডপ প্রাঙ্গনে মণিপুরি মহারাসলীলা সেবা সংঘের উদ্যোগে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিরা ১৮২ তম বার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসুচী অনুষ্ঠিত হয়। রাত ৮টায় মণিপুরি মহারাসলীলা সেবা সংঘের সভাপতি প্রকৌশলী যোগেশ^র সিংহের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ ও নির্মল এস পলাশের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো: ইসরাইল হোসেন, পুলিশ সুপার এম, কে, এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন পিপিএম-সেবা, লক্ষ্মীপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পদ্মাসন সিনহা, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদর্শন রায়, কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়নাল আবেদীন, কমলগঞ্জ থানার ওসি সৈয়দ ইফতেখার হোসেন প্রমুখ।

অপরদিকে আদমপুরে মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্সে রাসোৎসবের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের।

মণিপুরি মহারাসলীলা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ জানান, মাধবপুর জোড়ামন্ডপ রাসোৎসব সিলেট বিভাগের মধ্যে ব্যতিক্রমী আয়োজন। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার আগমন ঘটে। বর্ণময় শিল্পসমৃদ্ধ বিশ্বনন্দিত মণিপুরি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবে সবার মহামিলন ঘটে। রাত ১২টার দিকে শিববাজারের জোড়াম-পে (পরস্পর সংলগ্ন তিনটি ম-পে) এবং অন্যদিকে তেতইগাঁওয়ে সানা ঠাকুরের ম-পে (বর্তমানে সেখানেও দুটি ভিন্ন মঞ্চে রাস হয়) শুরু হয় এই উৎসবের মূল পর্ব মহারাস। মণিপুরিদের রাসলীলার অনেক ধরন। নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, বসন্তরাস, মহারাস, বেনিরাস বা দিবারাস। শারদীয় পূর্ণিমা তিথিতে হয় বলে মহারাসকে মণিপুরিরা পূর্ণিমারাসও বলে থাকে।

Manual1 Ad Code

মণিপুরি অধ্যূষিত মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ও আদমপুরে আশ্বিন মাসের শেষ ভাগেই উৎসবের সাড়া পড়ে যায়। উপজেলার মণিপুরি সম্প্রদায়ের লোকের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও মেতে ওঠে একদিনের এ আনন্দ উৎসবে।

উল্লেখ্য, মণিপুরিদের প্রধান উৎসব রাসপূর্ণিমা বা রাস উৎসব শরতের পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়। তার আবেদন ধর্মের সীমানা ভেঙে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে কাছে টেনে নিয়েছে। উপজেলার মাধবপুর শিববাজারে মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায়ের (জোড়ামন্ডপে) ১৮২ তম বছর এবং আদমপুরের তেতইগাঁওয়ে মণিপুরি মৈতৈ সম্প্রদায়ের ৩৯ বছর ধরে মণিপুরিদের রাস উৎসব উদ্যাপিত করে আসছে। রাস উৎসবের দুটি পর্ব। দিনের বেলায় রাখালরাস আর রাতে মহারাস অনুষ্ঠিত হয়।

Manual5 Ad Code

রাখালরাসের ম-লী বা মঞ্চ মাঠের মাঝখানে ভূমিসমতলে হয়ে থাকে, যাকে ঘিরে বৃত্তাকারে কলাগাছের বেষ্টনী। চারদিকে বসে মেলা। দেশের নানা জায়গা থেকে সওদাগরের দল এই এক দিনের জন্য আগের দিন থেকে এসে পসরা সাজায়। সঙ্গে থাকে মণিপুরিদের পোশাক, হস্তশিল্প, বইপুস্তক। রাখালরাস শেষ হয় গোধূলিবেলায়। কৃষ্ণ তাঁর গোপসখাদের নিয়ে গরুর পায়ের খুরে রাঙা আলোয় ধূলি ওড়াতে ওড়াতে ঘরে ফিরে আসেন। রাখালরাস শেষেই কিন্তু দিনের মেলা সাঙ্গ হয় না। লোকজনের কেনাকাটা, গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া চলতে থাকে। তারপর উন্মুক্ত মঞ্চে রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলেঅচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাসের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হয়, আধুনিক গান-নাচ-নাটক, এসবও বাদ যায় না।

পরম আরাধ্য এক সত্তার সঙ্গে মানুষে প্রেমাকুল আত্মার মিলনকে গীত-নৃত্য-বাদ্য-যন্ত্রসহযোগে প্রকাশ করার এক পরিবেশনা শিল্প রাস। শ্রীমদ্ভাগবত, চৈতন্যদর্শন কিংবা বৈষ্ণবীয় সহজিয়া ধারার দর্শনের সীমা ছাড়িয়ে যা মণিপুরি জনপদের নিজস্ব শিল্প প্রকাশরীতির সঙ্গে মিলেমিশে নতুন এক অবয়ব নিয়েছে। আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যাপিত জীবনের বেদনা ও অনুভূতি যেখানে স্পন্দিত হয়ে ওঠে।

Manual5 Ad Code

মণিপুরে রাসলীলা প্রবর্তনের একটি গল্প প্রচলিত আছে। মণিপুরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র যখন কাঞ্চিপুর নামের এক অঞ্চলে বাস করতেন, তখন এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন, শ্রীকৃষ্ণ নিকটবর্তী ভানুমুখ পাহাড়ে কাঁঠালগাছ হয়ে রাজার জন্য অপেক্ষা করছেন। পরদিনই রাজা সেই পাহাড়ে গিয়ে কাঁঠালগাছ খুঁজে পেলেন। গাছটি কেটে রাজধানীতে আনা হলো। রাজধানীর খ্যাতনামা শিল্পীকে রাজা তার স্বপ্নে দেখা কৃষ্ণমূর্তির অনুকরণে কাঠের মূর্তি গড়তে আদেশ দিলেন। এই মূর্তি প্রতিষ্ঠা উপলক্ষেই তিনি ওই বছর অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা পূর্ণিমাতে মহারাসলীলা উৎসব প্রবর্তন করেন। মেয়ে বিম্বাবতীও সেই রাসে অংশ নেন। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৭৭৯ সালে। রাসলীলার গানগুলো বিখ্যাত বৈষ্ণব পদকর্তা জয়দেব, বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখের পদাবলি থেকে সংগৃহীত। বাংলা, ব্রজবুলি, মৈথিলি ও সংস্কৃত ভাষার পদ সংকলিত হলেও সাম্প্রতিক কালে মণিপুরি ভাষাতেও (বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ) রাসলীলার পদ বা গান রচিত হচ্ছে।

সবশেষে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপের আরতি করা হয়। কিন্তু পরমাত্মা কৃষ্ণ তো জীবাত্মা রাধার সঙ্গে চির-একাত্ম হতে পারেন না। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’র মতো তার আসা-যাওয়ার লীলা। তাই নিশান্তে কৃষ্ণের বচনানুসারে রাধা ও গোপিণীরা নিজ নিজ গৃহে ফিরে যায়। এই প্রত্যাবর্তন গভীর বেদনাবহ, পরমপুরুষের বিচ্ছেদের সুরে ঘেরা। রাধার চোখের জলে ফেরার সে পথ ধোয়া। রাসলীলায় কৃষ্ণসঙ্গ লাভের এই একটি রাত রাধার জীবনে একটি কালেরই প্রতীক, যার আঁধারে প্রতিটি বৈষ্ণব খুঁজে চলে পরমসত্তাকে অনুভবের স্পন্দন। তার আঁচ নিয়ে ভোরবেলা ভক্তবৃন্দ ফিরতে থাকে নিজ নিজ ঠিকানায়।#

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২ - ২০২৪
Theme Customized By BreakingNews

Follow for More!