ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি ::
সুনামগঞ্জ–৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য ও মনোনয়ন প্রতিযোগিতার শেষে অবশেষে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সমর্থনের ঘোষণা দিলেন বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা—বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির আহবায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন এবং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী।
স্থানীয় রাজনীতিতে এই দৃশ্যপট বিএনপির জন্য বড় ধরনের ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, বহু দিনের জট খুলে এখন সত্যিকার অর্থেই ঐক্যের পথে হাঁটছে সুনামগঞ্জ–৫ ছাতক দোয়ারাবাজারের আসনে বিএনপি।
গত মঙ্গলবার বিকেলে কালারুকা ইউনিয়নের রাজাপুর জয়েন্ট কনভেনশন হলে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা বিএনপি, পৌর বিএনপি এবং অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের যৌথ সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলের শান্ত বাতাসে সেদিনের সমাবেশ এক পর্যায়ে পরিণত হয় দলীয় শক্তি প্রদর্শনের জমকালো আয়োজনে।
সভাপতিত্ব করেন উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। পরিচালনা করেন পৌর বিএনপির আহবায়ক শামছুর রহমান শামছু এবং উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য আবু সুফিয়ান।
সভামঞ্চে বক্তৃতা দিতে উঠে প্রথমেই ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেন দলের মনোনীত প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। তাঁর কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, বক্তব্যে ছিল দীর্ঘদিনের সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন,“ছাতক ও দোয়ারাবাজারে বিএনপি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী। আমরা অতীতেও একসাথে কাজ করেছি, অভিজ্ঞতা আছে প্রচুর। এবারও ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামবো। নেতাকর্মীরা আজ যে উৎসাহ দেখিয়েছেন, তাতে আমরা ইতোমধ্যেই ঐক্যের বিজয় অর্জন করেছি। এবার আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি—ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরীর বক্তব্য। মনোনয়ন না পেলেও তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সমথন করে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন,দলের প্রতি সম্মান এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমি আমার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি। ছাতক–দোয়ারার বিএনপি সবসময় ঐক্যবদ্ধ ছিল, আছে এবং থাকবে। এখানে কোনো বিরোধ ছিল না; ছিল দলীয় প্রতিযোগিতা। আমরা সবাই বিএনপির সৈনিক।
আগামী ২২ জানুয়ারি আচরণবিধি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ধানের শীষের প্রচারণায় একসাথে মাঠে নামবো।”তার বক্তব্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো হলে। নেতাকর্মীরা হাত তালি আর স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন পরিবেশ। অনেকেই বলেন, দুই নেতার এক মঞ্চে দাঁড়ানোই প্রমাণ করে সুনামগঞ্জ–৫ ছাতক দোয়ারাবাজার আসনে বিএনপিতে আর কোনো বিভক্তি নেই।
মঞ্চে ছিলো উপস্থিতির জোয়ার নেতার বক্তব্যের আগেই সমাবেশের চারপাশ জুড়ে ভিড় করতে থাকেন ছাতক ও দোয়ারাবাজারের বিভিন্ন ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। ব্যানার– শ্লোগান আর দলীয় প্রতীক খচিত পতাকা সমাবেশস্থলে এনে দেয় নির্বাচনী উত্তাপ।
বক্তারা বলেন,এতোদিন সবাই ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়েছি। নিজেদের জন্য কেউ ভোট চাইনি। দল যাকে প্রার্থী করেছে, তার পক্ষে নিবেদিত ভাবে কাজ করা আমাদের দায়িত্ব। সুযোগ সবাই পায় না, এবার দল কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে দায়িত্ব দিয়েছে। তাই তাঁর বিজয়ের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আরও বলা হয়, বিএনপির মূল শক্তি মাঠের নেতাকর্মী। তাদের ত্যাগ, পরিশ্রম ও নিষ্ঠাতেই দল বাঁচে—এই বার্তাই ছিল বক্তব্যে বক্তব্যে।ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিলো দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর হাত মেলানো এক সময় যাঁরা একই আসনে মনোনয়ন–প্রতিযোগিতায় ছিলেন, সেই মিলন–মিজান যখন সমাবেশে একে অপরকে অভিনন্দন জানান, তখন দর্শকের সারিতে উৎসাহের ঝড় বয়ে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃশ্যই সবার নজরদারি, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ এবং ক্ষমতাসীন দলের অদৃশ্য শক্তির মুখে বিএনপিকে নতুন শক্তি দিলো।
ছাতক–দোয়ারাবাজার বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেন, দীর্ঘদিনের দলীয় প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও দুই নেতা যে মঞ্চে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন, তা প্রমাণ করে আগামীর নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির কৌশল একটাই—ঐক্য। এই ঐক্যের মাধ্যমেই তারা জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে চায়।
স্লোগানে স্লোগানে কয়েকবার থমকে গিয়েছিলো বক্তারা। ‘ধানের শীষ চাই’, ‘তারেক রহমানের নির্দেশ এক—ঐক্যবদ্ধ বিএনপি শক্তিশালী হোক’, ‘ছাতক–দোয়ারায় মিলন–মিজান একসাথে’—এমন স্লোগানে পুরো হল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।
অনেকেই বলেন, এ ধরনের শো–ডাউন দীর্ঘদিন পরে দেখা গেল। বিশেষ করে দুই নেতার একই মঞ্চে উঠা ছিল সমাবেশের প্রধান আকর্ষণ।
প্রার্থী মিলনের আত্মবিশ্বাস বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন মিলন বলেন,“আমাদের দল সারা দেশে সংগঠিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ–৫ ছাতক দোয়ারাবাজার আসনে এ আজ যেভাবে নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়েছেন, তা প্রমাণ করে যে এখানে ঐক্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দল আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, কিন্তু বিজয় হবে দলের এবং জনগণের। ধানের শীষের জন্য আমরা সবাই মাঠে আছি।”
তিনি আরও বলেন,“ছাতক ও দোয়ারাবাজার আগেও আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। নিজেদের মধ্যের ভেদাভেদ ভুলে অদৃশ্য শক্তির মোকাবেলা করতে হবে। জনগণ পরিবর্তন চায়, সেই পরিবর্তনের প্রতীক ধানের শীষ।”
মিজানুর রহমানের মনোনয়ন প্রত্যাহার ছিল সমাবেশের মোড় ঘোরানো ঘটনা অনেকেই আশা করেছিলেন তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবেই মাঠে থাকবেন। কিন্তু দলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘোষণাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট অনেকটাই দূর করেছে।
তিনি বলেন,“আমি দল করি, দলই আমার পরিচয়। দল যাকে বেছে নিয়েছে, আমরা তার পাশে থাকবো। ধানের শীষ জিতলে জিতবেন তারেক রহমান—আমাদের নেতা, আমাদের আশার প্রতীক। সমাবেশ ঘিরে কালারুকা ইউনিয়নের রাজাপুর বাজার এলাকায় ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ছাতক পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড, দোয়ারাবাজার উপজেলা থেকে মোটরসাইকেল, মিনিবাস, পিকআপে করে আসেন নেতাকর্মীরা। মাত্র একটি সাংগঠনিক সভা হয়েও উপস্থিতি ছিল নির্বাচনী সমাবেশের চেয়েও বেশি—এমন মন্তব্য স্থানীয়দের।
অতীতের বিভক্তি ভুলে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুই নেতার সমর্থন–ঘোষণা বিএনপিকে নতুন গতি দিয়েছে। সমাবেশ শেষে সাধারণ নেতাকর্মীদের মন্তব্য—এবার সুনামগঞ্জ–৫ ছাতক দোয়ারাবাজার আসনে বিএনপি সত্যিই শক্ত অবস্থানে।###
caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/eibela12/public_html/wp-includes/functions.php on line 6121caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/eibela12/public_html/wp-includes/functions.php on line 6121
Leave a Reply