কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি ::
টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে রড লাগিয়ে হাত, পা বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় টানা দু’ঘন্টা নির্যাতন করা হয়েছে এক যুবককে। খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য তাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। পরিবার সদস্যরা গুরুতর আহত ইমদাদুল হক ইমন (২৮)কে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছেন। নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে, গত ১ মে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭ ঘটিকায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার ইউনিয়নের শহীদনগর বাজারের রয়েল ওয়ার্কশপে ।
স্থানীয় সূত্র ও নির্যাতিতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, পতনঊষার ইউনিয়নের পতনঊষার গ্রামের মিছবাউর রহমানের পুত্র ইমদাদুল হক ইমন পেশায় সিএনজি-অটো চালক। সম্প্রতি বাজারের রয়েল এর ওয়ার্কশপে গাড়ির কাজ করে চলে যান। পরে ওয়ার্কশপের মালিক রয়েল এর সাড়ে ৭ হাজার টাকা চুরির অপবাদে সন্ধ্যায় ওয়ার্কশপ এর দুই কর্মচারীসহ কয়েকজন ইমনকে বাজার থেকে ধরে নিয়ে যায় ওয়ার্কশপে। সেখানে নিয়ে তাঁর হাত, পা একত্র করে লোহার রড লাগিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে মাটিতে ফেলে দেন। পরে প্লাস্টিকের কেবল দিয়ে জয়নাল মিয়াসহ ৪-৫ জন মিলে পর্যায়ক্রমে টানা ২ঘন্টা তার উপর নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্ব্বক স্বীকারোক্তি ও ৪ হাজার ২শ’টাকা আদায় করেন। খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য তোয়াবুর রহমান এসে তাকে উদ্ধার করেন।
নির্যাতিতের ভাই খালেদুর রহমান বলেন, ‘আমার ভাই ইমদাদুল হক সিএনজি-অটো চালক। সে কখনো চুরি করেনি। তবে রয়েল ওয়ার্কশপে গিয়ে স্বাদ দোকানের মালিক জয়নাল মিয়া গিয়ে নির্যাতন চালান। জয়নাল মিয়া আমার ভাইকে তার সাথে জাল টাকার ব্যবসায় সহযোগিতার কথা বলেন। আমার ভাই তাতে রাজি না হওয়ায় জয়নাল মিয়া হুমকি দেয় আমার ভাইকে ফাঁসাবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার ভাইয়ের পায়ের মাঝখানে রড লাগিয়ে হাত, পা বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় টানা আড়াই ঘন্টা নির্যাতন করে। খবর পেয়ে আমি ভাইকে উদ্ধার করার জন্য সেখানে গেলে জয়নাল মিয়া আমাকেও মারধোর করে। পরে মেম্বার সাহেবকে বলার পর তিনি এসে ভাইকে উদ্ধার করে আমাদের কাছ থেকে ৪ হাজার ২শ’ টাকা নিয়ে ওয়ার্কশপের মালিককে দিয়ে সাদা কাগজে আমার ভাইয়ের স্বাক্ষর নেন।’ তিনি আরও বলেন, আমার ভাই খুবই অসুস্থ্য। সে এখনও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। আমরা গত সোমবার আদালতে মামলা করতে গেলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বিষয়টি সালিশে দেখিয়ে দেয়ার কথা বলে স্থগিত রাখেন।
অভিযোগ বিষয়ে অভিযুক্ত জয়নাল মিয়া বলেন, ইমদাদুল হক স্বশিক্ষিত বিখ্যাত চুর। তাকে ধরে নেয়ার পর অনেকে নির্যাতন করেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যকারো ভিডিও আপলোড না করে ষড়যন্ত্রমূলক আমার ভিডিও ছাড়া হয়েছে। আমি সামনে বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে সম্পাদক প্রার্থী হওয়ায় আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত চলছে। তিনি আরও বলেন, আমি প্লাস্টিকের কেবল দিয়ে দু’টি বাড়ি দিয়েছি। তাকে পুলিশে দেয়ার আগেই মেম্বার এসে উদ্ধার করে নিয়ে যান।
পতনঊষার ইউপি সদস্য তোয়াবুর রহমান বলেন, ইমদাদুল হকের বাবা ও ভাই রাতে আমাকে ফোন দিলে বিষয়টি জানতে পারি। পরে সেখানে দ্রুত গিয়ে হাত বাঁধা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি। এসময়ে তাকে নির্যাতনের কথা কেউ আমাকে বলেনি। ইমদাদুলের চুরির স্বীকারোক্তিতে ৪ হাজার টাকা প্রতিপক্ষকে দেয়া হয়েছে।
পতনঊষার ইউপি চেয়ারম্যান অলি আহমদ খান বলেন, ইউএনও সাহেবের মাধ্যমে বিষয়টি জেনে সরেজমিন উভয় পক্ষকে ডেকে শান্তনা দিয়েছি এবং দু’পক্ষকে নিয়ে সামাজিকভাবে বসে সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছি। তাকে কেন মারা হয় সে বিষয়সহ দু’চারদিনের মধ্যেই সামাজিক বৈঠকে বসবো।
এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ থানার ওসি মো. আব্দুল আউয়াল বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ নেই। নির্যাতিতের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ আসেনি। তবে আমরা খোঁজ নেয়ার পর চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন বিষয়টি সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান এ ঘটনায় দু:খপ্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি খুবই নিন্দনীয় ও অমানবিক। পতনঊষার ইউপি চেয়ারম্যানকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য বলেছি। না হলে নির্যাতিতদের থানায় অভিযোগ দেয়ার জন্য বলেছি।#