ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি ::
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সুনামগঞ্জ–৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। প্রচার–প্রচারণার প্রথম দিকটায় মাঠ কিছুটা নীরব থাকলেও সম্প্রতি প্রার্থীদের তৎপরতা, কেন্দ্রভিত্তিক সক্রিয়তা এবং মিছিল–সমাবেশে ব্যাপক অংশগ্রহণে এলাকা এখন উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত এ আসনের সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। তবে মাঠের প্রচারণা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে ত্রিমুখী একটি লড়াই—বিএনপি বনাম জামায়াত ইসলামি ও খেলাফত মজলিস। কওমি ভোট কোনদিকে যাবে, শেষ পর্যন্ত এই ভোটই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফলের রূপরেখা।
১০ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে দুই প্রার্থী—তৃণমূলে বিভ্রান্তি চরমে ১০ দলীয় ঐক্যজোট আনুষ্ঠানিকভাবে এ আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিলেও মাঠের বাস্তবতা তার ঠিক উল্টো।
একই জোটের ব্যানার ব্যবহার করে দুটি ভিন্ন দলের বৈধ প্রার্থী এখন সরব প্রচারণায় ব্যস্ত। ফলে তৃণমূলে বিভ্রান্তি তীব্র হয়েছে।
জামায়াত দাবি করছে তারা “১০ দলীয় ঐক্য–সমর্থিত”।অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীও একই দাবি তুলেছেন। দুই প্রার্থীর সমান্তরাল প্রচারণায় ঐক্যের বার্তা মাঠে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি ভোটারদের মধ্যে অস্পষ্টতা সৃষ্টি করছে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দুই দিকেই সমর্থকদের পদক্ষেপ অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।
খেলাফতের মাঠে শক্তি বাড়ছে—তবু সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে জামায়াত স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন—জামায়াত ইসলামির কাঠামোগত সংগঠন, দীর্ঘদিনের ভোট ব্যাংক এবং গ্রামভিত্তিক নেটওয়ার্ক তাদের শক্তি ধরে রেখেছে।
তবে খেলাফত মজলিস এ নির্বাচনে নতুন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কওমি ঘরানার ব্যাপক তৃণমূল প্রভাব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং তার অনুসারীদের বড় একটি অংশ খেলাফতের দিকে ঝুঁকতে পারে—এসব উপাদান খেলাফতের প্রার্থীকে কিং–মেকার অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হাফিজ মাওলানা আব্দুল কাদির (দেওয়াল ঘড়ি) দিনদিন সক্রিয়তা বাড়িয়ে চলেছেন। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এলাকাগুলোয় তার প্রচারণা শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। অনেক গ্রামের ভোটার—যারা আগে চরমোনাইয়ের দিকে ঝুঁকতেন—তারা এখন তাদের “ঘনিষ্ঠ আদর্শিক অবস্থান” ধরে রাখতে খেলাফতের দিকে সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছেন।
ঐক্য ফিরে পেয়ে বিএনপির নতুন গতি—মাঠে সুবিধাজনক অবস্থায় মিলন সুনামগঞ্জ–৫ এ বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন কয়েক মাস ধরেই নানা আলোচনা–সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
মনোনয়ন নিয়ে দলে যে উত্তাপ তৈরী হয়েছিল, তা মনোনয়নবঞ্চিত মিজানুর রহমান চৌধুরীর প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও কলিম উদ্দিন আহমেদের প্রতি সমর্থন ঘোষণার মধ্য দিয়ে পুরোপুরি প্রশমিত হয়েছে।
ফলে দীর্ঘদিন পর বিএনপির মধ্যে দৃশ্যমান ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তৃণমূলে নতুন উদ্দীপনা ফিরে এসেছে। গণসংযোগ, পথসভা, উঠোন বৈঠক, ডিজিটাল প্রচারণা—সব জায়গাতেই গতি এসেছে।
দলের নেতাকর্মীরা বলছেন—ঐক্য ফিরে আসায় কলিম উদ্দিন মিলন এখন “সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে” আছেন।
অন্যদিকে ফুলতলী পীর অনুসারী সংগঠন—বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহ—এর আনুষ্ঠানিক সমর্থন বিএনপির প্রার্থীকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। এটি উত্তর ছাতক–দোয়ারাবাজারের অনেক গ্রামেই সাংগঠনিক গতিশীলতা সৃষ্টি করেছে। জামায়াতের ভরসা দীর্ঘদিনের ভোট ব্যাংক—আওয়ামীঘরানার অনেকে প্রচারণায় জামায়াত ইসলামির প্রার্থী আবু তাহের মোহাম্মদ আব্দুস সালাম আল মাদানী (দাঁড়িপাল্লা) দলীয় সংগঠন ও পুরোনো ভোট ব্যাংকের ওপর নির্ভর করেই মাঠ সাজিয়েছেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ ঘরানার অনেক নেতাকর্মীকেও জামায়াতপন্থী গণসংযোগ ও মিছিলে দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে এলাকায় আলোচনা তীব্র হয়েছে।
জামায়াত নেতারা বলছেন—আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। খেলাফত আমাদের ভোট কাটতে পারলেও সরাসরি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের নেতারা দাবি করছেন—১১ দলীয় ঐক্যের সমর্থন ও কওমি ভিত্তির সমন্বয়ে আমাদের শক্তি প্রতিদিন বাড়ছে।” এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানই আসনের ভোট হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যান্য প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও প্রভাব সীমিত এই আসনে জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর আলম (লাঙ্গল) এবং এনপিপির মো. আজিজুল হক (আম) প্রার্থী থাকলেও তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত। গ্রাম থেকে শহর—কোথাও তাদের প্রচারণা উল্লেখযোগ্য আলোড়ন তুলছে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন—এদের উপস্থিতি সামান্য ভোট বিভাজন ঘটালেও চূড়ান্ত হিসাব–নিকাশে তা খুব বড় ভূমিকা রাখবে না।
কওমি ভোট—শেষ মুহূর্তের ‘গেম চেইঞ্জার’। পুরো নির্বাচনী অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন—কওমি ভোট কোথায় যাবে?
কওমি ভিত্তির বড় অংশ যদি খেলাফত মজলিসের দিকে যায়—তবে তারা তৃতীয় শক্তি নয়, বরং কিং–মেকার হয়ে উঠতে পারে। জামায়াতের কওমি ভোট সবসময়ই শক্ত; কিন্তু বিভক্ত পরিবেশে তাদের সাংগঠনিক শক্তি আগের মতো একমুখী থাকবে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিএনপির পক্ষে কওমি ভোট সাধারণত কম; তবে আল ইসলাহ–র সমর্থন এই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ কারণে অনেক বিশ্লেষক বলছেন—“এই আসনের নির্বাচন শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে কওমি ভোটের চূড়ান্ত স্রোতের ওপর।
সমগ্র চিত্র—বিএনপি এগিয়ে, তবে শেষ লড়াই হবে ভোট–যুদ্ধের দিনে মাঠের প্রচারণা, সাংগঠনিক শক্তি, তৃণমূলের অংশগ্রহণ, জোট–রাজনীতির জটিলতা—সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ–৫ আসনের রাজনৈতিক পরিবেশ এখন অত্যন্ত উত্তপ্ত।
পর্যবেক্ষকদের মতে:বিএনপি এগিয়ে, কারণ তাদের সংগঠন ঐক্যবদ্ধ এবং প্রার্থী মিলন মাঠে শক্ত অবস্থায়।
জামায়াতও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, দীর্ঘদিনের ভোট ব্যাংকের কারণে।খেলাফত মজলিস হবে ‘ডার্ক হর্স’, যারা চাইলে শেষ মুহূর্তে পুরো ফলাফল বদলে দিতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়—সুনামগঞ্জ–৫ আসনের নির্বাচন ক্রমেই রূপ নিয়েছে বিএনপি বনাম জামায়াতের মূল লড়াইয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত কওমি ভোটের স্রোতই নির্ধারণ করবে জয়ের পাল্লা কোনদিকে ঝুঁকবে।###
caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/eibela12/public_html/wp-includes/functions.php on line 6121caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/eibela12/public_html/wp-includes/functions.php on line 6121
Leave a Reply